লিখেছেন: মিলটন মণ্ডল, সম্পাদক - টিপিএফ বাংলা:
২২ জুলাইয়ের মাহাত্ম্য ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়; ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না। কিছু দিন ক্যালেন্ডারে শুধু একটি তারিখ হয়ে থাকে, আবার কিছু দিন হয়ে ওঠে জাতীয় চেতনার ভিত্তি। ২২ জুলাই তেমনই একটি দিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনেই গণপরিষদ স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা—তেরঙাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত আজও ভারতীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং জাতীয় ঐক্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক হয়ে আছে।আজ যখন আমরা তেরঙার দিকে তাকাই, তখন শুধু তিনটি রং বা মাঝখানের অশোকচক্র দেখি না; আমরা দেখতে পাই দুশো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস, অসংখ্য বিপ্লবীর আত্মত্যাগ, কারাবন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্বপ্ন এবং অগণিত শহিদের রক্তে লেখা এক জাতির জাগরণের কাহিনি। তেরঙার প্রতিটি ভাঁজ যেন ইতিহাসের একটি করে অধ্যায়।
এই পতাকার পথচলা সহজ ছিল না। ১৯০৬ সালে কলকাতায় প্রথম ভারতীয় পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে ভিকাজি কামার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের পতাকা উন্মোচন, পিঙ্গলি ভেঙ্কাইয়ার নকশা, মহাত্মা গান্ধীর ভাবনা এবং দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা বাঁক পেরিয়ে ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই বর্তমান তেরঙা জাতীয় পতাকার মর্যাদা লাভ করে। চরকার পরিবর্তে অশোকচক্রের অন্তর্ভুক্তি ছিল স্বাধীন ভারতের চলমান অগ্রগতি, ন্যায় এবং ধর্মের পথে এগিয়ে চলার প্রতীক। স্বাধীনতার পর গত কয়েক দশকে এই পতাকা ভারতের প্রতিটি গৌরবময় মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে। সীমান্তে সেনাদের আত্মবলিদান, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বিজয়ের উল্লাস, মহাকাশে ভারতের সাফল্য কিংবা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিটি ঘটনায় তেরঙা আমাদের ঐক্য, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের যে প্রান্তেই ভারতীয়রা গেছেন, এই পতাকাই তাঁদের পরিচয়, গর্ব এবং আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। কিন্তু জাতীয় পতাকার প্রতি ভালোবাসা কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রকৃত শ্রদ্ধা তখনই প্রকাশ পায়, যখন আমরা সংবিধানের মূল্যবোধকে সম্মান করি, দেশের আইন মেনে চলি, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখি এবং নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করি। তেরঙার মর্যাদা রক্ষা মানে দেশের মর্যাদা রক্ষা; জাতীয় পতাকার সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা মানে স্বাধীনতার চেতনাকে জীবন্ত রাখা।
২২ জুলাই তাই শুধু ইতিহাস স্মরণের দিন নয়, আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা কি সেই আদর্শকে ধারণ করতে পেরেছি, যার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ আত্মত্যাগ করেছিলেন? আমরা কি স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই আজকের দিনের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে নিজের অতীতকে সম্মান করে এবং সেই ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করে। তাই ২২ জুলাই আমাদের কাছে কেবল একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; এটি জাতীয় চেতনার পুনর্জাগরণের দিন, ঐক্যের দিন এবং তেরঙার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্নবীকরণের দিন। আজকের এই দিনে প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়ে একটাই প্রত্যয় উচ্চারিত হোক—জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষা করব, স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধারণ করব এবং ঐক্য, শান্তি ও অগ্রগতির পথে দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পালন করব। এটাই হবে ২২ জুলাইয়ের প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
